লৌকিক অলৌকিক

প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করুন :--👍

 38 total views

গৌড়াধিপতি দেবপালতিনি পরমভক্ত ধার্মিক,

সুশাসক নৃপরাজ্যে শান্তি বিরাজিত চৌদিক।

দেবমন্দিরে মনোহর শ্যামদিব্যবিগ্রহ,

কনকমূর্তি কৃষ্ণে ভজেন দেবপাল অহরহ।

তিলকললাম,মাথে কেকীপাখামোহন মুরলী করে,

নিক্কণ বাজে চরণকমলেরাজার চিত্ত হরে।

রাজকার্যেই ব্যাস্ততথাপি অনিবার শ্যাম ধ্যান,

তাঁহার শোভায় রাজঅন্তরে আনন্দ অফুরান।

প্রতি প্রত্যুষে স্নানের অন্তে পুষ্পমালিকা চন্দন,

পুত সুরধুনী বারিতে করেন শ্রী হরির বন্দন।

পন্চপ্রদীপে বিষ্ণু আরতিঅন্তর শ্যামময়,

দেবতার ধ্যানে রাজহিয়াখানি অন্তর্মুখী রয়,

দেউলদুয়ার রুদ্ধ তখনবহির্জগৎ লুপ্ত,

কিন্তু নৃপের এহেন সেবার সন্দেশ নহে গুপ্ত।

গুর্জররাজ মিহিরভোজের একটি সূক্ষ্ম আশ,

দেবপালে তিনি করিবেন দাসস্পর্ধিত অভিলাষ।

গৌড়রাজের পূজার্চনার এমত সন্ধিক্ষণ,

সুযোগ সমীপেকরিলেন তিনি বংগ আক্রমণ।

রক্তিম পূব ঊষার গগনসদ্য সূর্যোদয়,

দেবপাল শ্যামধ্যানেতে মগ্নভোজরাজ নির্ভয়।

আসেন ত্বরায় দেবসেনাপতিলাউসেন বুঝি ক্রুদ্ধ,

তন্ময় নৃপ বিষ্ণু ব্যজনেমন্দির দ্বার রুদ্ধ।

হায়রে তাঁহারে কে দিবে এখন সংগ্রামে অনুমতি,

তবে কি গৌড় গুর্জর সনে স্বীকার করিবে নতি !

রাজমাতা তথা রাজমহিষীর প্রচেষ্টা নিষ্ফল,

ব্যর্থ মায়ের কাতর আকুতিরাণীর নয়নজল।

নরেশ তখন আত্মভোলা যেতাই কোনো আহ্বানে,

অন্তর বুঝি দেয় না কো সাড়ামুখর যে শ্যামগানে।

রাজসেনামুখ দেউল দুয়ারেচন্চল সবে ত্রস্ত,

কখন বাহিরে আসিবেন নৃপগৌড় বিপদগ্রস্ত।

কিন্তু তাহারা একটি কারণে বিষ্মিত কিন্চিত,

সহসা কিরূপে অরিহুঙ্কার স্তিমিত,অন্তরিত।

অবশেষে খোলে লৌহকপাটশ্যামপূজা সমাপন,

বাহিরে আসেন গৌড়নরেশজিজ্ঞাসু দুনয়ন।

হেরিয়া তাঁহারে সৈন্যবাহিনী জয়রব দেয় হর্ষে,

এক নিমেষেই দৃশ্যান্তর বুঝি কোনো যাদুস্পর্শে।

প্রণাম অন্তে কহেন সেনানীসুপ্রিয় মহারাজ,

মোদের রাজ্য গুর্জর দ্বারা অতিক্রান্ত আজ।

চাহি অনুমতিভোজরাজে আজি দিব সমুচিত শিক্ষা,

এমত দশাটি করিব তাঁহারমাগিবেন প্রাণভিক্ষা।

কহিলেন নৃপকোথা মোর হয়, কোথা শ্বেত রণহস্তী !

যুদ্ধক্ষেত্রে যাইব এখনিঅরি বিনাশেই স্বস্তি।

সহসা পরিধি সচকিত ভারীহ্রেষারব অবিশ্রান্ত,

রাজঅশ্বটি আসে দ্রুতবেগেবুঝি বা অধিক ক্লান্ত।

জিহ্বাটি ঘন লালায় সিক্তস্বেদ ঝরে হেথাহোথা,

কেমনে সাজিল রণসাজে হয়এতক্ষণ ছিল কোথা !

বিষ্মিত দেব,সেনা সেনানী ঘোটকের ভাব হেরি,

নৃপতি আসীন হস্তীপৃষ্ঠেবাজিল তুর্য্য ভেরী।

রাজ তুরগের বিশ্রাম হেতু হস্তীর বৃংহন,

চলেন রাজন বীরবিক্রমে লক্ষ্য রণাঙ্গণ।

কিন্তু সেথায় দৃশ্যটি হেরিদেবপাল বিহ্বল,

শত্রুসৈন্য অচৈতন্যঅতিশয় হীনবল।

তাহাদের মাঝে অসহায় অরি নৃপতি মিহিরভোজ,

দাঁড়ায়ে একাকী যুদ্ধক্ষেত্রেনয়ানে কাহারো খোঁজ।

দেবপালে হেরি গুর্জরপতি আসেন ত্বরায় ছুটি,

অশ্রুধারায় সিক্ত করেন নৃপতির কর দুটি।

কহেনরাজন,শ্যামলকান্তি তব সিপাহীর তরে,

সঁপি দিনু আজি তনমনপ্রাণকরুন বন্দী মোরে.

দিনু এইক্ষণে রাজত্বমম সম্পদ,ঐশ্বর্য্য,

আর একটিবার মিলিব তাহারেএই অনুনয় আর্য।

তাহার সমখে মম সেনাদলসকলেই হতবীর্য,

অপরূপ কায়া,তরুণ সিপাহীযেন সে দীপ্ত সূর্য।

শুনিবর্ণনা গৌড় নৃপের বিষ্ময়াবেশ ভারী,

কহেনহে ভোজ, গুর্জররাজ কিছুই বুঝিতে নারি।

শ্যামলকান্তি নবীন সিপাহীহৃদয় মাঝারে ছবি,

বাস্তব সাথে বড়ই অমিলকোথায় তাহারে লভি !

সহসা ভক্ত দেবপাল হিয়া অনুভবে শিহরণ,

নয়নে অশ্রু,মুখমণ্ডল বুঝি বা রক্তবরণ।

গুর্জররাজে আলিংগণধন্য আপনি ধন্য,

আপনার সনে গৌড়াধিপতি দীন,হীন অতি নগণ্য।

যাঁহার ধ্যানেতে মগণ অধম দেবপাল অনুক্ষণ,

লভিলেন আজি ভাগ্যবন্ত তাঁহারই যে দরশন।

তিনিই দেব শ্যামসুন্দরআর কে হইতে পারে !

সিপাহীর বেশে আসিলেন যিনি রক্ষা করিতে মোরে।

পুণ্য অধিক আপনার তাইহেরিলেন দেব শ্যামে,

গৌড়াধিপের কপোল ব্যাপিয়া অশ্রুর ঢল নামে।

আমি পাপিষ্ঠ,ভাগ্যপিষ্টসেইহেতু মম ইষ্ট,

দরশন মোরে দিলেন না এবেগৌড়নরেশ ক্লিষ্ট।

আপ্লুত ভোজ গুর্জররাজহে নৃপ ধার্মিক,

আপনার প্রতি অরি মনোভাবধিক্ মোরে শতধিক্।

এমন ভকতি তুলনাবিহীন বুঝি এই ধরামাঝে,

বিষ্ণু যাঁহার স্বয়ং সহায়অশ্রু কিরূপে সাজে !

আজি হতে দোঁহা পরম মিত্রবিদ্বেষভাবে ইতি,

আকর্ষণ করেন দেবেরেআপন বক্ষে স্থিতি।

গুর্জর সেনাফিরিল চেতনাপ্রণত শ্রী গোপীনাথে,

দুই পক্ষের সেনাবাহিনী প্রীতি উৎসবে মাতে।

সমরাঙ্গনে হইল সৃষ্টি মিলনমেলার চিত্র,

নহে কেহ অরিআনন্দ ভেরীপরস্পরের মিত্র।

দেবপাল সাথে মিহিরভোজের দীর্ঘ আলিংগণ,

ঝরিল না কোনো শোণিতবিন্দুবাঁধিল না মহারণ।

গৌড়নৃপতি,গুর্জরপতি দেব দেউলেতে আসি,

হেরিলেন শ্যামসুন্দরেআহা আননে অরূপ হাসি।

প্রতাপাণ্বিত মহারথীদ্বয়ে শত্রুতা অবসান,

মুরলিধর করেন রক্ষা দুজনার কুল মান।

গৌড়রাজ্যে সেদিন ঘটিল যে অত্যদ্ভুত ঘটনা,

ইতিহাস কভু দেয় না সাক্ষ্যবলে সব কল্পনা।

তথাপি কি মোরা দেব মহিমারে করিব অস্বীকার!

পাঠকের সনে সত্য মিথ্যা দিনু বিচারের ভার।

———————————————————-

    স্বপন চক্রবর্তী।

Publication author

একটি বহুজাতিক সংস্থায় প্রবন্ধক পদে কর্মরত ছিলাম। ২০১৭ সালে ৬০ বছর বয়সে অবসর নিয়েছি । এখন কবিতা ও গল্প লেখা আমার অবসরের সাথী।
Comments: 0Publics: 25Registration: 26-08-2020
প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করুন :--👍
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

একে অপরের কবিতায় মন্তব্য করে সমালোচনা করুন। আপনার পরিচিতি লাভ করুন।