![]()
আমি তো লক্ষ্মী
কলমে— সুব্রত পণ্ডিত
সংকলন— প্রতিধ্বনির পরে
নামটি আমার লক্ষ্মী,
মা বলত, “আমার লক্ষ্মী মেয়ে,
বাবার চোখের মণি,”
মুখের হাসি দেখেই
ভরে উঠত ঘরখানি।
এই নামেতেই জড়িয়ে ছিল
আদর, ভালোবাসা,
স্বপ্নের কত বুনুনি।
শ্বশুরবাড়ির মানুষ বলত,
“আমাদের লক্ষ্মী বউ!”
সংসারটাকে আপন করে
সাজিয়েছিলাম মন দিয়ে,
সবার সুখে সুখ খুঁজেছি
নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়ে।
হঠাৎ একদিন দুর্ঘটনায়
নিভল আমার সিঁথির আলো,
সিঁদুর মুছে গেল,
মুছল না চোখের জলের লাজ,
যে সংসার ছিল আপন আমার,
সেই সংসারেই পর হলাম,
আমি অ-লক্ষ্মী আজ।
সংসার সাজিয়ে যাদের দেই,
সেই হাতেই আজ ঝাঁটা,
যে মুখে ছিল লক্ষ্মী নামটি,
সেই মুখে গঞ্জনার কাঁটা।
একদিন যে শ্বশুরবাড়ি
বলত, “লক্ষ্মী এ ঘরের,”
আজ সেই নাম হারিয়ে গেছে,
অবহেলার ধুলোয় পড়ে।
বেঁচে থাকার তাগিদে আজ
অন্যের বাড়ি কাজ করি,
কারও বাসন, কারও কাপড়,
কারও ঘরদোর পরিষ্কার করি।
সকাল থেকে সন্ধে অবধি
খাটতে খাটতে যাই,
তবু দুটো কথা শুনতে হয়—
“অলক্ষী! লক্ষ্মীছাড়া!”
উপাধি পাই।
কথাটা শুনে বুকের ভেতর
কী যে ভাঙে, কী যে মরে,
শুধু চোখের জলটা
লুকিয়ে রাখি আঁচল ভরে।
বাবা-মা আজও
ডাকে আমায় লক্ষ্মী বলে,
কিন্তু সে ডাক শুনতে পাই না
এই শহরের কোলাহলে।
মনে পড়ে মায়ের মুখ,
বাবার স্নেহভরা চোখ,
তাঁদের দেওয়া নামের পাশে
আজ কত অপমানের শোক!
হারায়নি ‘লক্ষ্মী’ নামটি
হারিয়েছে তার মান,
বিধবা বলে সমাজ কেন
কেড়ে নেয় সম্মান?
আমি তো সেই মেয়ে,
সেই তো লক্ষ্মী,
শুধু কপাল শূন্য হয়েছে—
শূন্য হয়নি হৃদয়খানি।
কেউই জানে না,
এই নামের আড়ালে
কত কান্না জমে আছে,
কত না-বলা কাহিনি…
আমি লক্ষ্মী—
আমার নামটা ঝালিয়ে নাও,
আমার হারানো সম্মানটুকু
একবার ফিরিয়ে দাও।
আমি স্বামীহারা তবে…
লক্ষ্মীহারা নই—
আমি অসহায় হয়েছি,
অসম্মানের যোগ্য নই।
কী অপরাধ আমার?
আমি কি তবে লক্ষ্মী নই?
হারিয়েছি কি বাঁচার অধিকার?
স্বাধীনতা, বলো— তুমি কার?
আজও আমার বুকের ভেতর
ভালোবাসার প্রদীপ জ্বলে,
তবু কেন সবাই আমায়—
আজও লক্ষ্মীছাড়া বলে?
আজও লক্ষ্মীছাড়া বলো…
আমি তো লক্ষ্মী।
আমি তো লক্ষ্মী…
![কবিকল্পলতা প্রকাশনী [Kobikolpolota Prokasoni]](https://prokasoni.kobikolpolota.in/wp-content/uploads/2020/08/pro-nw-m-logo.png)