![]()
সেদিনও বাজারে সবজি বিক্রি হচ্ছিল,
আলু, বেগুন, টমেটো –
তর্ক হচ্ছিল দাম নিয়ে,
কারও মুখে বিরক্তি, কারও মুখে হাসি।
কেবল দূরে কোথাও
মেশিনগানের শব্দ
কেউ একজনের কথার ফাঁকে
হঠাৎ ঢুকে পড়ে,
আবার চুপ করে যায়,
যেন ভুলে যাওয়া কোনো শব্দের মতো।
স্কুলের ছেলেটা
বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে
রাস্তার মোড়ে থেমে থাকে,
ওর চোখে আজকাল অদ্ভুত এক আগুন,
বাংলা মানচিত্রের উপর সে আঙুল রাখে
একেকটা জেলা ছুঁয়ে বলে,
“এগুলো সব আমার হবে,
তাদের কোনো না।”
মা ভোরবেলা
চুলায় হাঁড়ি চাপান,
চালের পরিমাণ কম,
জল একটু বেশি,
তাও তিনি বলেন—
“আজ ভাত হবে,
যোদ্ধারা আসবে তো?”
মসজিদের ইমাম
আজকাল দোয়ার শেষে
দেশের কথাও বলেন,
শব্দগুলো খুব সাধারণ,
কিন্তু মাথা নত হয়ে আসে
অজান্তেই।
রাত নামলে
গ্রামের সব আলো নিভে যায়,
শুধু দূরের আকাশে
লাল রেখা টেনে যায় গোলার আগুন,
কেউ বলে কিছু না,
শুধু বিছানার বাঁকে
কাঠের বন্দুক জড়িয়ে ধরে
এক কিশোর,
যেন এটিই তার একমাত্র বালিশ।
কেউ কেউ হারিয়ে যায়,
তাদের নাম ধীরে ধীরে
উচ্চারণ ছেড়ে দেয় মানুষ,
তবু আড়ালে
মহিলারা থালা ধুতে ধুতে
মনে মনে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠেন,
“ও ছিল ভালো ছেলে,
আমাদের বাড়িরও আত্মীয় হতো।”
ডিসেম্বরের এক সকালে
হঠাৎ করে বাতাস বদলে যায়,
রেডিওর গলায়
অত্যন্ত সাধারণ এক ঘোষণা,
তবু মানুষের কান কেঁপে ওঠে,
কারও গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রু,
সে জানেও না
কোন শব্দে কাকে ধন্যবাদ দেবে।
পথের ধারে
একটি ভাঙা সেতু,
তার গায়ে এখনো শুকিয়ে থাকা
রক্তের দাগ,
ওটার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
একজন বৃদ্ধ থামে,
ছড়ি ঠেকিয়ে
ধীরে ধীরে বলে ওঠে—
“এইগুলোর দামেই
তুই আজ স্বাধীন হইছস, বাপ।”
তারপর সবকিছু
আবার যেন স্বাভাবিক হয়ে যায়—
বাজারে আবার সবজি বিক্রি হয়,
স্কুলে ছেলেরা পড়তে যায়,
মসজিদে আজান হয় ঠিক সময়মতো।
শুধু রাতে
বাতাসের ভেতর
হালকা বারুদের গন্ধ
মিশে থাকে কোথাও,
আর আমাদের নিঃশ্বাসে
অল্প একটু করে
মুক্তিযুদ্ধ ঢুকে যায় প্রতিদিন,
অজান্তে।
—
![কবিকল্পলতা প্রকাশনী [Kobikolpolota Prokasoni]](https://prokasoni.kobikolpolota.in/wp-content/uploads/2020/08/pro-nw-m-logo.png)